বিশেষ প্রতিবেদক
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ—পররাষ্ট্র সচিব পরিবর্তনের গুঞ্জন এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের স্থলাভিষিক্ত হতে বেশ কয়েকজন সিনিয়র কূটনীতিকের নাম আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু এই দৌড়ঝাঁপে এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম জোরালোভাবে সামনে আসছে, যা প্রশাসন ও কূটনৈতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। তিনি হলেন ব্রাজিলে পদায়িত বাংলাদেশের বিতর্কিত রাষ্ট্রদূত মো. তৌহিদুল ইসলাম। ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক স্খলন এবং আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন কর্মকর্তা দেশের কূটনীতির শীর্ষ পদের জন্য বিবেচিত হতে পারেন—তা নিয়ে এখন খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরে-বাইরে তীব্র সমালোচনা চলছে।
জানা যায়, ২০১৩ সালে ইতালির মিলানে কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে তারই অধস্তন নারী সহকর্মীকে মানসিক হেনস্থা, যৌন হয়রানি ও পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহারের লিখিত অভিযোগ ওঠে। বিভাগীয় তদন্ত ও প্রত্যাহার:পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে সেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা (Recall) হয়। পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে তাকে ওএসডি করা হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে পুরো বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।
কূটনীতিকের এই নৈতিক স্খলনের কারণে নেদারল্যান্ডসে এ্যাগ্রিমোও প্রত্যাখ্যাত হয়। নেদারল্যান্ডস সরকার কর্তৃক এগ্রিমো (Agrément – রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের আনুষ্ঠানিক সম্মতি) না দেয়ার পেছনে মূলত তার অতীত কর্মজীবনের নানা বিতর্ক ও নৈতিক স্খলনকেই বড় করে দেখা হয়। মিলানে নারী কেলেংকারী ঘটনার কারণে ডাচ সরকার তাকে এগ্রিমো প্রদান করেনি।
আবার ২০২৩ সালে তৌহিদুল ইসলামকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু তাঁর অতীত নৈতিক স্খলনের রেকর্ড খতিয়ে দেখে অস্ট্রিয়া সরকারও তাকে ‘অ্যাগ্রিমো’ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে অস্ট্রিয়ার ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী আলেকজান্ডার শ্যালেনবার্গকে চিঠি লিখে অনুরোধ করলেও ভিয়েনা তাদের অবস্থানে অনড় থাকে। একজন বিতর্কিত কূটনীতিককে ডিফেন্ড করতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন নজিরবিহীন তদবির আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
সে সময় অস্ট্রিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যম (যেমন: Yenivatan.at) এবং ইংরেজি দৈনিক Vindobona-য় এই কেলেঙ্কারি ও প্রত্যাখ্যানের খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়: “We expect all ambassadors serving in to be impeccable and honest. In the event of any suspicion to the contrary, we reserve the right not to conclude an agreement.”
ভিয়েনায় জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দফতর অবস্থিত। এমন একটি সংবেদনশীল বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে একজন নৈতিক স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পাঠাতে চাওয়া ছিল এক চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব।
বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে সেখানেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। যা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। অভিযোগ, তিনি এবং তার স্ত্রীর রূপচর্চা, স্পা এবং বিধি-বহির্ভূত সৌন্দর্যবর্ধন সংক্রান্ত চিকিৎসার নামে ভুয়া মেডিকেল বিল ও ভাউচার দাখিল করে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা পকেটে পুরেন। বিদেশে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন অপচয় সত্যিই নজিরবিহীন।
বর্তমানে বিশ্ব এক জটিল অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডলার সংকটের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষা করতে হলে একজন অত্যন্ত দূরদর্শী, দক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পররাষ্ট্র সচিবের প্রয়োজন। বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র যুগে কোনো দেশের নেতিবাচক তথ্যই আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-উত্তর পরিস্থিতিতে পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখছে। এই সময়ে পররাষ্ট্র সচিবের মতো একটি সংবেদনশীল পদে এমন কাউকে বসানো, যার নাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নারী কেলেঙ্কারি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত, তা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।



